নিউইয়র্ক সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে তারেক...
নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার বার্তা নিয়ে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট...
জকিগঞ্জে সবুজের মাঝে সম্ভাবনার গ্রাম
ছবি সংগৃহীত
এম এ ওয়াহিদ চৌধুরী :: জকিগঞ্জ উপজেলায় সবুজে ঘেরা শান্ত-স্নিগ্ধ এক জনপদ। চারপাশে গাছগাছালি, বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, খাল-নালা আর গ্রামীণ পথ। পাশ দিয়ে চলে গেছে জকিগঞ্জ-আটগ্রাম সড়ক। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে গড়ে ওঠা এমনই একটি সম্ভাবনাময় গ্রাম পলাশপুর।
জকিগঞ্জ উপজেলার ৩নং কাজলসার ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত এ গ্রামে বসবাস করেন আনুমানিক ২ হাজার ২০০ মানুষ। ভোটার প্রায় ৮৫০ জন। প্রধান সড়কের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হওয়ায় গ্রামটির অবস্থান বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাইরের যোগাযোগ ভালো হলেও গ্রামের অভ্যন্তরে ঢুকলে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাই এখন পলাশপুরবাসীর উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
প্রকৃতির ছোঁয়ায় সুন্দর এক গ্রাম:
জকিগঞ্জ-আটগ্রাম সড়কের পশ্চিম পাশে সড়ক ঘেঁষে পলাশপুরের অবস্থান। গ্রামের চারদিকে ছড়িয়ে আছে সবুজের সমারোহ। কৃষিজমি, গাছগাছালি, খাল-নালা আর গ্রামীণ জনপদের স্বাভাবিক সৌন্দর্য মিলে পলাশপুরকে দিয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।
বর্ষা ও শরৎকালে সবুজ ধানক্ষেতের বুক চিরে যাওয়া গ্রামের মেঠোপথ, চারপাশের গাছপালা ও নির্মল পরিবেশ সহজেই যে কারও মন কাড়ে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা এই গ্রামটি যেন সম্ভাবনার এক নীরব ঠিকানা।
তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে দীর্ঘদিনের কিছু প্রয়োজন ও প্রত্যাশা।
গ্রামবাসীর প্রধান দাবি—যোগাযোগের উন্নয়ন:
পলাশপুরে দু’টি মসজিদ রয়েছে। রয়েছে পারিবারিক ও সম্মিলিতভাবে ব্যবহৃত একাধিক গোরস্থান। কৃষক, শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষের পাশাপাশি গ্রামে রয়েছেন অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষও।
তবে গ্রামে বর্তমানে কোনো সরকারি বা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকলেও শিক্ষিত মানুষের উপস্থিতি গ্রামটির সম্ভাবনার কথাই জানান দেয়।
সবকিছু ছাপিয়ে গ্রামবাসীর প্রধান চাওয়া যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। তাদের ভাষায়, গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাস্তা পর্যায়ক্রমে প্রশস্ত, মাটি ভরাট ও পাকাকরণ করা গেলে পলাশপুরের চেহারাই বদলে যাবে।
পশ্চিমের দুই সড়ক পাকাকরণের দাবি:
পলাশপুরের পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে এলজিইডির পাকা রাস্তা রয়েছে। কিন্তু গ্রামের পশ্চিম অংশের দুটি সরকারি আইডিভুক্ত রাস্তা এখনো পাকাকরণ হয়নি। এসব রাস্তা বাস্তবায়িত হলে গ্রামের সঙ্গে আশপাশের এলাকার যোগাযোগ আরও সহজ হবে।
গ্রামবাসীর অন্যতম প্রধান দাবি হলো—রতনগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উত্তরের এলজিইডির পাকা সড়ক থেকে উত্তরমুখী হয়ে আইয়ব আলী সাহেবের বাড়ি হয়ে পশ্চিমমুখী চৌধুরী বাজার পর্যন্ত সরকারি আইডিভুক্ত রাস্তাটি পাকাকরণ।
এটি শুধু পলাশপুরের মানুষের জন্য নয়, আশপাশের ৭/৮টি গ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। তবে পাকাকরণের আগে প্রয়োজনীয় স্থানে রাস্তা প্রশস্তকরণ ও মাটি ভরাটের কাজ করা জরুরি।
অন্যদিকে আইয়ব আলী সাহেবের বাড়ির পূর্ব পাশের কালভার্ট থেকে সোজা উত্তরমুখী হয়ে গোটারগ্রাম আজাদ মিয়ার বাড়ির পাশ দিয়ে গোটারগ্রাম-চৌধুরী বাজার এলজিইডি সড়ক পর্যন্ত রাস্তাটিও পাকাকরণের দাবি রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, এই দুটি রাস্তা উন্নত করা গেলে পলাশপুরের পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের চলাচলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
অভ্যন্তরীণ যোগাযোগেও প্রয়োজন নজর:
গ্রামের ভেতরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক নিয়েও রয়েছে এলাকাবাসীর দাবি।
পলাশপুর দক্ষিণ জামে মসজিদ থেকে উত্তরমুখী হয়ে তবারক আলী সাহেবের বাড়ি হয়ে গ্রামের পশ্চিমের সরকারি আইডিভুক্ত রাস্তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এছাড়া জকিগঞ্জ-আটগ্রাম সড়ক থেকে পলাশপুর ফুলবাড়ি'র উত্তরের যাত্রীছাউনি হয়ে মাওলানা নিজাম উদ্দিন তাপাদারের বাড়ি পর্যন্ত দক্ষিণমুখী রাস্তাটি প্রশস্তকরণ ও পাকাকরণের দাবিও রয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো:—জকিগঞ্জ-আটগ্রাম সড়ক থেকে পলাশপুর-গোটারগ্রাম জামে মসজিদের দক্ষিণ পাশ দিয়ে পশ্চিমমুখী রাস্তাটি মাটি ভরাট ও পাকাকরণ। এ পথটি স্থানীয় মুসল্লি, শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের চলাচলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একই সঙ্গে ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলাম হীরা সাহেবের বাড়ির দক্ষিণ পাশের দোকান থেকে পশ্চিমমুখী হয়ে মাওলানা এখলাছুর রহমানের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তাটি পাকাকরণের দাবিও রয়েছে।
একটি একটি করে কাজ হলেই বদলে যাবে চিত্র:
গ্রামবাসীর বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—তারা রাতারাতি বড় কোনো পরিবর্তন চান না। তাদের প্রত্যাশা, প্রয়োজন ও গুরুত্ব বিবেচনা করে পরিকল্পিতভাবে একটি একটি করে রাস্তাগুলোর উন্নয়ন করা হোক।
প্রথমে রাস্তা প্রশস্তকরণ, প্রয়োজনীয় স্থানে মাটি ভরাট, কালভার্ট ও অন্যান্য অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন করে পর্যায়ক্রমে পাকাকরণ করা হলে দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল পাওয়া যাবে।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, এসব কাজ বাস্তবায়িত হলে পলাশপুরের যোগাযোগ সমস্যা অনেকটাই দূর হবে। কৃষিপণ্য বাজারজাত করা, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, রোগী পরিবহন, মসজিদে যাতায়াত কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজনে মানুষের চলাচল—সব ক্ষেত্রেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এসব উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নে সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান-এর সহযোগিতা ও কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশা করছেন এলাকাবাসী।
বিশুদ্ধ পানিরও প্রয়োজন:
যোগাযোগের পাশাপাশি পলাশপুরের অন্তত ২২টি পরিবারের জন্য গভীর নলকূপ স্থাপনের দাবি রয়েছে। বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা দিতে এসব পরিবারের জন্য গভীর নলকূপ স্থাপন করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তাদের মতে, যোগাযোগের উন্নয়নের পাশাপাশি নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা গেলে গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার মানও আরও উন্নত হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই, আছে শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা:
পলাশপুরে কোনো সরকারি বা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকাটা গ্রামের অন্যতম ঘাটতি। অথচ এই গ্রামে রয়েছেন অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষ। কৃষক, শ্রমিক ও বিভিন্ন পেশার মানুষের পাশাপাশি শিক্ষিত একটি জনগোষ্ঠীও রয়েছে এখানে।
ভবিষ্যতে জনসংখ্যা ও প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে গ্রামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে—এমন প্রত্যাশাও রয়েছে এলাকাবাসীর। এতে গ্রামের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বাড়বে এবং নতুন প্রজন্মের জন্য আরও সুন্দর পরিবেশ তৈরি হবে।
যোগাযোগ পেলে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলবে:
পলাশপুরের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ ও প্রকৃতি। একদিকে কৃষিনির্ভর জীবন, অন্যদিকে শিক্ষিত ও সচেতন মানুষের উপস্থিতি। তার সঙ্গে রয়েছে জকিগঞ্জ-আটগ্রাম সড়কের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান।
অর্থাৎ, সম্ভাবনার জন্য প্রয়োজনীয় অনেক উপাদানই পলাশপুরে রয়েছে। শুধু প্রয়োজন পরিকল্পিত যোগাযোগ অবকাঠামো ও মৌলিক নাগরিক সুবিধার সম্প্রসারণ।
গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাস্তা পাকাকরণ করা গেলে শুধু চলাচলের সুবিধাই বাড়বে না; কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
প্রকৃতি দিয়েছে সৌন্দর্য, উন্নয়ন দিতে পারে নতুন পরিচয়। পলাশপুরের পথে হাঁটলে একদিকে সবুজ কৃষিজমি, অন্যদিকে গাছগাছালিতে ঘেরা বসতবাড়ি। কোথাও খাল, কোথাও মেঠোপথ, কোথাও সবুজ ফসলের মাঠ। জকিগঞ্জ-আটগ্রাম সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় পুরো গ্রামটিই যেন প্রকৃতির একটি সুন্দর ফ্রেমে বাঁধা।
এই গ্রামটির সৌন্দর্যকে আরও অর্থবহ করে তুলতে প্রয়োজন শুধু উন্নত যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা।
পলাশপুরবাসীর প্রত্যাশা খুব বেশি নয়—তারা চান চলাচলের উপযোগী রাস্তা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং ধীরে ধীরে একটি শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ।
পরিকল্পিতভাবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা উন্নয়ন করা সম্ভব হলে পলাশপুরের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ যেমন কমবে, তেমনি গ্রামটির সম্ভাবনার দুয়ারও খুলে যাবে।
প্রকৃতি পলাশপুরকে দিয়েছে অপার সৌন্দর্য; এখন প্রয়োজন উন্নয়নের স্পর্শ। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে সবুজে ঘেরা এই জনপদটি শুধু সুন্দরই নয়, হয়ে উঠতে পারে আরও সমৃদ্ধ, স্বাবলম্বী ও সম্ভাবনাময় একটি উপজেলা হবে জকিগঞ্জ।
এসএ/সিলেট