প্রণবকান্তি দেবের 'জানা পথে অজানা...
চিরাচরিত প্রকাশনা অনুষ্ঠানের বিপরীতে এক ভিন্ন আঙ্গিকে প্রণবকান্তি দেব-র 'জানা পথে অজানা প্রান্তরে' গ্রন্থের পাঠ ও পাঠ প্রতিক্রিয়া উদযাপিত হলো। শনিবার (৫...
ফাইল ছবি
এম এ ওয়াহিদ চৌধুরী:: সুরমা নদীর তীরে কীন ব্রিজের পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সিলেটের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা ‘আলী আমজাদের ঘড়ি’। প্রায় দেড়শ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী এই ঘড়ি শুধু সময় জানানোর একটি স্থাপনা নয়—এটি সিলেটের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নগর ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এবার সামনে এসেছে ঘড়িটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নবাব পরিবারের অবদান ও পারিবারিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু নথিপত্র।
সম্প্রতি আলী আমজাদ খানের বংশধর নওয়াবজাদা আলী ওয়াজিদ খান-এর পরিচয়পত্র এবং ১৮৭৫ সালের একটি সরকারি চিঠির তথ্য সামনে এসেছে। এসব নথিতে সিলেটের তৎকালীন সমাজ ও নগর উন্নয়নে নবাব পরিবারের আর্থিক অবদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়।
১৮৭৫ সালের সরকারি চিঠিতে ১০ হাজার টাকা দানের তথ্য:
প্রকাশিত ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, ১৮৭৫ সালের ৪ আগস্ট সিলেটের তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার এ. এল. ক্লে (A. L. Clay) একটি চিঠি প্রেরণ করেন। চিঠিতে সিলেটের মরহুম মৌলভী আলী আহমেদ খান, যিনি আলী আমজাদ খানের পিতা, সিলেট শহরের উন্নয়ন, ঘড়ি স্থাপন এবং চ্যারিটেবল ডিসপেনসারি/হাসপাতাল নির্মাণের জন্য নগদ ১০ হাজার টাকা দান করেছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
চিঠিটি আলী আমজাদ খানের অভিভাবক মোসাম্মৎ তালেফুন্নেসা খাতুনের উদ্দেশে পাঠানো হয়েছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
ঐতিহাসিক এই চিঠিটি সিলেট শহরের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তৎকালীন বিত্তশালী ও প্রভাবশালী পরিবারগুলোর ভূমিকা এবং জনকল্যাণমূলক কাজে তাদের অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
পরিচয় মিলেছে নবাব পরিবারের বংশধরের: এদিকে সামনে আসা জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যে নবাব পরিবারের বংশধর হিসেবে নওয়াবজাদা আলী ওয়াজিদ খান-এর নাম পাওয়া গেছে। পরিচয়পত্র অনুযায়ী তাঁর পিতার নাম নওয়াবজাদা আলী ছফওয়াত খান এবং মাতার নাম সাইয়েদাতুন্নেছা বেগম। পরিবারের বংশধরদের সঙ্গে কথা বলে আলী আমজাদের ঘড়িকে ঘিরে তাদের দীর্ঘদিনের স্মৃতি ও আবেগের কথাও জানা গেছে।
‘ছোটবেলা থেকেই ঘড়িটি দেখে আসছি’: পরিবারের আত্মীয় মারুফ বক্তিয়ার চৌধুরী খুররম বলেন, “এই ঘড়িটি আমাদের বাবার জন্মেরও আগের। আমরা জন্মের পর থেকেই ঘড়িটি দেখে আসছি। একসময় সবার কাছে ঘড়ি ছিল না। তখন এই ঘড়ি থেকে সময়ের ঘণ্টাধ্বনি শোনা যেত। কয়টা বাজে, তা জানার জন্য মানুষ এই ঘড়ির দিকে তাকাতেন বা এর আওয়াজ শুনতেন। আমাদের কাছে এটি শুধু একটি ঘড়ি নয়, এটি আমাদের পরিবারের ইতিহাস ও সিলেটের ঐতিহ্যের অংশ।”
তিনি আরও বলেন, “আলী আমজাদের ঘড়িটি সিলেটের মানুষের কাছে অত্যন্ত পরিচিত একটি স্থাপনা। ঘড়িটির সঙ্গে আমাদের পরিবারের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আমরা সিলেট সিটি কর্পোরেশনকে ধন্যবাদ জানাই—তারা ঘড়িটির রক্ষণাবেক্ষণ করছেন।”
নিয়মিত সংস্কারের আহ্বান : ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি সংরক্ষণে নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। ঘড়িটির কোনো অংশ নষ্ট হলে বা সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিলে সিলেট সিটি কর্পোরেশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে—এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি বলেন, “আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে সিলেট সিটি প্রশাসককে ধন্যবাদ জানাই। আমরা আশা করি, ভবিষ্যতেও আলী আমজাদের ঘড়ির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে সিটি কর্পোরেশন এটি নিয়মিত সংস্কার ও সংরক্ষণ করবে।”
শুধু ঘড়ি নয়, সিলেটের ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী: সুরমা নদীর তীরে কীন ব্রিজের পাশে অবস্থিত আলী আমজাদের ঘড়ি দীর্ঘদিন ধরে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে সিলেটের একটি পরিচিত প্রতীক। পর্যটকরা সিলেটে এসে কীন ব্রিজ, সুরমা নদী ও আলী আমজাদের ঘড়ি দেখতে ভিড় করেন। সময়ের সঙ্গে নগরীর চেহারা বদলালেও এই ঘড়ি এখনো দাঁড়িয়ে আছে অতীতের সাক্ষী হয়ে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্রিটিশ আমলের সিলেট, নবাব পরিবারের ইতিহাস এবং নগর উন্নয়নের নানা স্মৃতি।
ঐতিহাসিক সরকারি চিঠি ও নবাব পরিবারের বংশধরদের তথ্য সামনে আসায় আলী আমজাদের ঘড়ির ইতিহাস অনুসন্ধানে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পুরোনো নথি যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও যাচাই করা গেলে সিলেটের স্থানীয় ইতিহাসের অনেক অজানা অধ্যায় সামনে আসতে পারে।
সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণে আলী আমজাদের ঘড়ির মতো স্থাপনাগুলোকে শুধু পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে নয়, বরং ঐতিহাসিক দলিল ও নগর-ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করা জরুরি। নতুন প্রজন্মের কাছে এসব স্থাপনার ইতিহাস তুলে ধরতে গবেষণা, পুরোনো দলিল সংরক্ষণ এবং তথ্যভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি উঠেছে।
আলী আমজাদের ঘড়ি তাই আজ কেবল সময় জানানোর যন্ত্র নয়—এটি সিলেটের অতীত, ঐতিহ্য ও মানুষের স্মৃতির এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে সিলেটের ঐতিহ্য হয়ে দাড়িয়েছে।
এসএ/সিলেট